কলকাতায় ভয়াবহ বৃষ্টি: জলমগ্ন শহর, বিপর্যস্ত জনজীবন, প্রকট নিকাশি ব্যবস্থার দুর্বলতা
কলকাতা, ১৭ জুন, ২০২৫: মঙ্গলবার সকাল থেকে অবিরাম বর্ষণে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কলকাতা মহানগরী। একটানা প্রবল বৃষ্টির জেরে শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে, যার ফলে জনজীবন থমকে গেছে। রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে নিচু এলাকা, সর্বত্রই হাঁটু থেকে কোমর জল জমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার। যানজট, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহে ব্যাঘাত সহ একাধিক সমস্যায় জর্জরিত শহরবাসী।
বৃষ্টিপাতের পরিসংখ্যান ও পূর্বাভাস:
আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় শহরে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা বহু বছরের গড়কে ছাড়িয়ে গেছে। নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় ১২০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টাতেও বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি এবং বজ্রবিদ্যুৎ সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, ফলে জল জমার সমস্যা আরও বাড়তে পারে। আগামী দু'দিন পশ্চিমবাংলা জুড়ে মৌসুমী বায়ুর সক্রিয়তা বাড়বে বলেও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা শহরবাসীর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
কোন কোন এলাকা জলমগ্ন?
শহরের প্রাণকেন্দ্র ধর্মতলা, পার্ক স্ট্রিট, এসপ্ল্যানেড, গড়িয়াহাট, রাসবিহারী অ্যাভিনিউ, লেক টাউন, উল্টোডাঙ্গা, সেন্ট্রাল এভিনিউ, বেহালা, কসবা, ঠনঠনিয়া, মানিকতলা, শ্যামবাজার, বেলগাছিয়া, এবং সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জল জমে যাওয়ায় যান চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এমনকি শহরের বহু প্রধান রাস্তা ও অলিগলিতে জল জমে গিয়েছে। পার্কিং করা অনেক গাড়ির অর্ধেকই ডুবে গেছে জলে।
জনজীবনে প্রভাব:
সকাল থেকেই বাস, ট্রাম এবং ট্যাক্সি আটকে পড়েছে জলে। বেশ কিছু সরকারি ও বেসরকারি বাস জলমগ্ন রাস্তায় বিকল হয়ে পড়ে, যার ফলে যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। অফিসগামী মানুষ এবং স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি। অনেককেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে জলমগ্ন রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। বহু মানুষ বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে সাইকেল রিকশা বা ভ্যান রিকশার আশ্রয় নিচ্ছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহকারী গাড়িগুলিও আটকে পড়ায় বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ পরিষেবা ব্যাহত হওয়ায় মানুষের ভোগান্তি আরও বেড়েছে।
নিকাশি ব্যবস্থার দুর্বলতা:
কলকাতার জলনিকাশি ব্যবস্থার দুর্বলতা আরও একবার প্রকট হয়ে উঠেছে এই ভয়াবহ বৃষ্টির পর। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই নিকাশি ব্যবস্থা বর্তমানে শহরের বিপুল জনসংখ্যা এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের ভার বহন করতে অক্ষম। শহরের প্রাকৃতিক ঢাল পূর্বদিকে হলেও, ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাস এবং নতুন নতুন আবাসন প্রকল্পের কারণে সেই ঢালও অনেক জায়গায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নর্দমাগুলিতে আবর্জনা জমে থাকায় জল নিকাশের প্রক্রিয়া আরও ধীর হয়ে পড়ছে। কলকাতা পুরসভার পক্ষ থেকে জল সরানোর জন্য পাম্প চালানো হচ্ছে, কিন্তু বৃষ্টির তীব্রতার কাছে তা পর্যাপ্ত হচ্ছে না। অনেক নিচু বাড়িতেও জল ঢুকে যাওয়ায় বাসিন্দারা আতঙ্কিত।
স্বাস্থ্য ঝুঁকির আশঙ্কা:
দীর্ঘক্ষণ জল জমে থাকায় ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া এবং অন্যান্য জলবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা বাড়ছে। ইতিমধ্যেই এসএসকেএম হাসপাতাল, ক্যালকাটা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল সহ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের আউটডোর ও প্রাঙ্গণে জল জমে যাওয়ায় রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের চরম অসুবিধা হচ্ছে। স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে নাগরিকদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার এবং ফোটানো জল পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের পদক্ষেপ:
কলকাতা পুরসভা এবং রাজ্য প্রশাসন পরিস্থিতি মোকাবিলায় তৎপর রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। মেয়র ফিরহাদ হাকিম জানিয়েছেন, সমস্ত পাম্পিং স্টেশনকে উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে এবং অতিরিক্ত পাম্প নামানো হয়েছে। তবে হুগলি নদীতে জোয়ার থাকায় জল নামতে সময় লাগছে বলেও তিনি জানান। নাগরিকদের সতর্ক থাকার এবং প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না বেরোনোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই আকস্মিক বৃষ্টিপাত এবং জলমগ্নতা কলকাতার রোজকার জীবনযাত্রায় বড়সড় ছন্দপতন ঘটিয়েছে। আগামী কয়েকদিন পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সমস্যা আরও জটিল হতে পারে।


Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন